নির্মলেন্দু গুণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নির্মলেন্দু গুণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

উল্লেখযোগ্য স্মৃতি | নির্মলেন্দু গুণ


উল্লেখযোগ্য স্মৃতি

__নির্মলেন্দু গুণ

আমার ভালোবাসা কিংবা প্রেম-সংক্রান্ত
কোনো স্মৃতি নেই, যাকে ঠিক ভালোবাসা
কিংবা প্রেম বলা যায়।

একদিন টুকুদি নাকের ডগার বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে
বলেছিল: তোর বউ তোকে খুব ভালবাসবে দেখিস।
সে-ই আমার প্রেম, সেই আমার সর্বপ্রথম কল্পনায়
রমনীয় ভালোবাসা পাওয়া, হঠাৎ যৌবন-ছোঁয়া
কিশোরের প্রথম প্রণয়। আর কোনো স্মৃতি নেই।

একদিন নখ কাটতে কাটতে আঙুল কেটে গেলে
প্রেমের শিশির হয়ে রক্ত ঝরেছিল,
ডেটলে রক্তাক্ত ক্ষত ধুয়ে মুছে দিয়ে পূরবী বলেছিল,
আমি তার চিরকালের শত্রু।
আমি আজও শত্রু-মিত্র তফাৎ বুঝি না।
নিজের শত্রু হয়ে আমি আজও অপেক্ষমান,
ঘুরেফিরে স্মৃতির সমুখে এসে এখনো দাঁড়াই।

আমার এছাড়া ভালোবাসা কিংবা প্রেমের কাছাকাছি
আর কোনো স্মৃতি নেই, সে-ই আমার প্রেম,
অদ্যবধি সেই আমার পূণ্য ভালোবাসা!

আমার একাকী যাত্রা, জীবনের নিঃসঙ্গতা বুঝে
সদ্যবিবাহিতা আমারই সহোদরা
সিঁথিতে রঙিন চাঁদ মেখে একদিন
শিয়রের কাছে বসেছিল: চল ক'দিন আমার বাড়ি,
সমুদ্রের হাওয়ায় কাটাবি।

আমি জানি আজো সেই সমুদ্রের হাওয়া,
আজো সেই একমাত্র ভালবাসা স্মৃতি,
আজো সেই মুহূর্তের প্রেম।

আমার ভালোবাসা কিংবা প্রেম-সংক্রান্ত
আর কোনো স্মৃতি নেই।

রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১

প্রত্যাবর্তনের আনন্দ | নির্মলেন্দু গুণ




প্রত্যাবর্তনের আনন্দ
__নির্মলেন্দু গুণ

পাক-কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে
যেদিন আমি আমার প্রিয় মাতৃভুমির
মুক্ত-মাটিতে পা রেখেছিলাম; ওটাই
ছিল আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন।
আমার কাছে, স্বর্গপ্রবেশতুল্য
মাহেন্দ্র মুহুর্ত ছিল তা।

লন্ডন ও দিল্লির আকাশ পাড়ি দিয়ে
বাংলাদেশের নীলিমায় প্রবেশ করেই
আমি স্মরণ করেছিলাম আমার স্রষ্টাকে,
আমার মাতৃভুমির মুক্তির সংগ্রামে
নেতৃত্ব দেবার জন্য যিনি আমাকে
বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছিলেন।

আমাকে বরণ করার জন্য অপেক্ষমাণ
জনতার স্রোত প্রবহমান নদীর মতন
আমাকে সেদিন ভাসিয়ে নিয়েছিল
সেই চিরসবুজ স্বপ্নের উদ্যানে−,
যেখানে দাঁড়িয়ে আমার দেশবাসীকে
আমি স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম স্বাধীনতার।

আমাকে একটুখানি দেখার আশায়
স্বাধীনতার ঐ সবুজ উদ্যানে তখন
অপেক্ষা করছিল গোটা বাংলাদেশ।

যার কণ্ঠ থেকে সর্বদা বর্ষিত হতো বজ্র,
প্রস্ফুটিত হতো শব্দের অগ্নিকুসুম,
সেই দ্বিপ্রহরে বজ্র এবং অগ্নির বদলে
তার চোখ থেকে ঝ'রে পড়েছিল অশ্রু;
বজ্রকন্ঠ থেকে স্বপ্নপূরণের কান্না।

বিজয়ের আনন্দে আমি বলেছিলাম−
কবিগুরু, দেখে যান−আপনার কবিতা
আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে−
আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।

আনন্দের ঘোর কাটতে না কাটতেই,
একাত্তরের পরাজিত এজিদবাহিনী
রাত্রির অন্ধকারে সংগঠিত হয়ে
পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট
সপরিবারে হত্যা করল আমাকে।

ওরা কারাগারের ভিতরে প্রবেশ করে
হত্যা করল চার জাতীয় নেতাকে;
আমার কারাবাসকালে
যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ওরা আমাদের রক্তলব্ধ সংবিধানকে
পিষ্ট করল সামরিক বুটের তলায়।
ওরা ইতিহাসকে করল বিকৃত।
আবহমান বাঙালির হৃদ্যরক্তস্রোতে
ওরা বপন করল বিষবৃক্ষের বীজ।

ওরা জানত না, মিথ্যার মেঘ দিয়ে
ঢাকা যায় না সত্যের সুর্য চিরদিন।
ওরা জানত না, এই মৌন উদাসীন
প্রকৃতিও বিকৃতিকে সমর্থন করে না।

সর্বস্ব হারিয়েও আমি বিশ্বাস করেছি−
বাঙালিকে অবিশ্বাস করা পাপ।
বিলম্বে হলেও, ওদের চক্রান্ত তাই
ব্যর্থ হয়েছে,
ব্যর্থ হয়েছে,
ব্যর্থ হয়েছে।
বুলেটের চেয়ে বড় ব্যালট-বিপ্লবে
আজ বিজয়ী হয়েছে আমার মানুষ।

আজ আমি অনুভব করছি সেই আনন্দ,
যা আমি অনুভব করেছিলাম
আমার প্রথম স্বদেশ-প্রত্যাবর্তনের দিন।

মৃত্যুকে পশ্চাতে ফেলে, মৃত্যুঞ্জয় হয়ে
আজ আমি পুনর্বার ফিরে এসেছি
আমার প্রিয় স্বদেশের শুদ্ধ নীলিমায়।
বৃক্ষ হয়ে, ফুল হয়ে, প্রজাপতি হয়ে
আমি প্রদক্ষিণ করব এই দেশকে।
কিশোরীর আদরের রাজহাঁস হয়ে
আমি ভেসে বেড়াব জলাঙ্গির জলে।
রবিশস্য হব হেমন্তের ঘন কুয়াশায়।

বহুদিন পর আজ সত্য জয়ী হয়েছে−,
সংগ্রাম জয়ী হয়েছে, সুন্দর জয়ী হয়েছে।
আজ আমার খুব আনন্দের দিন।

১০ জানুয়ারি ২০০৯


সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২০

রবীন্দ্রনাথের বাঁশি | নির্মলেন্দু গুণ



রবীন্দ্রনাথের বাঁশি
__নির্মলেন্দু গুণ
                                          
যারা গান গাইতো বাঁশিতে আঙুল রেখে,
যারা কবিতা লিখতো মধ্যরাতে, সেইসব চাষী,
সেইসব কারখানার শ্রমিক, যারা ইস্পাতের
আসল নির্মাতা, যারা তৈরি করতো স্নো-বিস্কিট,
আমার জন্য শার্ট, নীলিমার জন্য শাড়ি, তারা এখন
অন্য মানুষ, তাদের বাড়ি এখন প্রতিরোধের দুর্গ।

যারা গান গাইতো বাঁশিতে আঙুল রেখে,
যারা ছাত্র ছিল পাঠশালার, বিশ্বের, সভ্যতার
কিংবা প্রকৃতির, সেইসব ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক
একত্রে মিলিত হয়ে ওরা এখন অন্যরকম;
ওরা এখন গান গায় না, ওরা এখন অন্য মানুষ।

কাঠের লাঙল যারা চেপে রাখতো মাটির ঔরসে,
সেইসব শিল্পী, সেইসব শ্রমিক,
যারা গান গাইতো বাঁশিতে আঙুল রেখে,
যারা স্বপ্ন দেখতো রাতে; ধলেশ্বরী নদী-তীরে 
পিসীদের গ্রাম থেকে ওরা এখন শহরে আসছে।

কাঠের লাঙল ফেলে লোহার অস্ত্র নিয়েছে হাতে,
কপালে বেঁধেছে লালসালুর আকাশ,
শহর জয়ের উল্লাসে ওরা রবীন্দ্রনাথকে বলছে
স্বাধীনতা, রবীন্দ্রনাথের গানকে বলছে স্টেনগান।
যারা গান গাইতো, বাঁশিতে আঙুল রেখে
যারা কবিতা লিখতো রাতে, সেইসব চাষী
আজ যুদ্ধের অভিজ্ঞ-কৃষক।

তোমার জন্য বন্দুকের নল আজ আমারো হাতের বাঁশি।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০১৬

বসন্ত বন্দনা

নির্মলেন্দু গুণ


হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্রসঙ্গীতে যত আছে,
হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে
বনের কুসুমগুলি ঘিরে। আকাশে মেলিয়া আঁখি
তবুও ফুটেছে জবা,—দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে,
তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্ত পথিক।

এলিয়ে পড়েছে হাওয়া, ত্বকে কী চঞ্চল শিহরন,
মন যেন দুপুরের ঘূর্ণি-পাওয়া পাতা, ভালোবেসে
অনন্ত সঙ্গীত স্রোতে পাক খেয়ে, মৃত্তিকার বুকে
নিমজ্জিত হতে চায়। হায় কি আনন্দ জাগানিয়া।

এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতই ফেরাই চোখ,
যতই এড়াতে চাই তাকে, দেখি সে অনতিক্রম্য।
বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্যখানি
নবীন পল্লবে, ফুলে ফুলে। বুঝি আমাকেও শেষে
গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে।

আমি তাই লঘুচালে বন্দিলাম স্বরূপ তাহার,
সহজ অক্ষরবৃত্তে বাঙলার বসন্ত বাহার।

সোমবার, ৯ জুন, ২০১৪

যাত্রা-ভঙ্গ

যাত্রা-ভঙ্গ
নির্মলেন্দু গুণ

নির্মলেন্দু গুণ

হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে,
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এক কে করি দুই?

হেমের মাঝে শুই না যবে,
প্রেমের মাঝে শুই
তুই কেমন করে যাবি?
পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া
আমাকেই তুই পাবি।

তবুও তুই বলিস যদি যাই,
দেখবি তোর সমুখে পথ নাই?

তখন আমি একটু ছোঁব,
হাত বাড়িয়ে জড়াব তোর
বিদায় দুটি পায়ে,
তুই উঠবি আমার নায়ে,
আমার বৈতরণী নায়ে?

নায়ের মাঝে বসব বটে,
না-এর মাঝে শোব?
হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ,
দুঃখ দিয়ে ছোঁব?

তুই কেমন করে যাবি?

আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও - নির্মলেন্দু গুণ


আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও

নির্মলেন্দু গুণ

তোমার পায়ের নিচে আমিও অমর হব,
আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও।

এই নাও আমার যৌতুক, এক-বুক রক্তের প্রতিজ্ঞা।
ধুয়েছি অস্থির আত্মা শ্রাবণের জলে, আমিও প্লাবন হব,
শুধু চন্দনচর্চিত হাত একবার বোলাও কপালে।
আমি জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে উড়াব গাণ্ডীব,
তোমার পায়ের কাছে নামাব পাহাড়।
আমিও অমর হব, আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও।

ডিসেম্বর ১৯৮১ | নির্মলেন্দু গুণ

ডিসেম্বর ১৯৮১
নির্মলেন্দু গুণ

এই কবিতাটির ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।
হোক না সে ছন্দ-নক্সা-পাড়হীন বিধবার পরিধেয়
সাদা থান শাড়ি। না থাক এর অন্ত্যমিলের চাতুর্য,
কিম্বা অনুপ্রাসের সাঙ্গীতিক দোলা। না থাক এর বুকে
কোনো স্পর্শকাতর বিস্ফোরক বা বিষাক্ত স্প্লিন্টার বা সেই
আশ্চর্য ম্যাজিক যা কবিতার কাছে কাম্য ছিলো একদিন।
এই কবিতার মধ্যে নাগরিক জীবনের যন্ত্রণার কথা নেই,
নেই পরকীয়া প্রেমের নিষিদ্ধ আনন্দ, দ্বন্দ্ব, খাঁচার ভিতরের
অচিন পাখির আধ্যাত্মিকতা। নেই মরমী বাউল বা কোনো
আত্মমগ্ন কবির মনোবৈকল্যের বিশ্লেষণ। এখানে রোমাঞ্চ নেই
রহস্যোপন্যাসের অলৌকিক ঈশ্বরের প্রশস্তিগাথা বা সদ্যমৃত
কোন প্রিয় বন্ধুর নির্জন কবরে সাজানোর যোগ্য এপিটাফ
এটি নয়। কোনো প্রতীকী ব্যঞ্জনা নেই এখানে শব্দের,
নেই বাক্যের অন্তরালে সূক্ষ্ম কোনো লুক্কায়িত বোধ।

ওটা কিছু নয় - নির্মলেন্দু গুণ


ওটা কিছু নয়

নির্মলেন্দু গুণ

এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব? পাচ্ছো না?
একটু দাঁড়াও আমি তৈরী হয়ে নিই।
এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব? পাচ্ছো না?
তোমার জন্মান্ধ চোখে শুধু ভুল অন্ধকার। ওটা নয়, ওটা চুল।
এই হলো আমার আঙুল, এইবার স্পর্শ করো, -না, না, না,
-ওটা নয়, ওটা কন্ঠনালী, গরলবিশ্বাসী এক শিল্পীর
মাটির ভাস্কর্য, ওটা অগ্নি নয়, অই আমি-আমার যৌবন ।

সুখের সামান্য নিচে কেটে ফেলা যন্ত্রণার কবন্ধ-প্রেমিক,
ওখানে কী খোঁজ তুমি? ওটা কিছু নয়, ওটা দুঃখ;
রমণীর ভালোবাসা না-পাওয়ার চিহ্ন বুকে নিয়ে ওটা নদী,
নীল হয়ে জমে আছে ঘাসে,-এর ঠিক ডানপাশে, অইখানে
হাত দাও, হ্যাঁ, ওটা বুক, অইখানে হাতা রাখো, ওটাই হৃদয় ।

অইখানে থাকে প্রেম, থাকে স্মৃতি, থাকে সুখ, প্রেমের সিম্ফনি;
অই বুকে প্রেম ছিল, স্মৃতি ছিল, সব ছিল তুমিই থাকো নি।

হুলিয়া

হুলিয়া

নির্মলেন্দু গুন
নির্মলেন্দু গুন

আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর,
চতুর্দিকে চিক্চিক করছে রোদ্দুর-’
আমার শরীরের ছায়া ঘুরতে ঘুরতে ছায়াহীন
একটি রেখায় এসে দাঁড়িয়েছে।

কেউ চিনতে পারেনি আমাকে,
ট্রেনে সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে একজনের কাছ থেকে
আগুন চেয়ে নিয়েছিলুম, একজন মহাকুমা স্টেশনে উঠেই
আমাকে জাপটে ধরতে চেয়েছিল, একজন পেছন থেকে
কাঁধে হাত রেখে চিৎকার করে উঠেছিল; -আমি সবাইকে
মানুষের সমিল চেহারার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছি।
কেউ চিনতে পারেনি আমাকে, একজন রাজনৈতিক নেতা
তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন, মুখোমুখি বসে দূর থেকে
বারবার চেয়ে দেখলেন-, কিন্তু চিনতে পারলেন না।
বারহাট্টায় নেমেই রফিজের স্টলে চা খেয়েছি,
অথচ কী আশ্চর্য, পুনর্বার চিনি দিতে এসেও
রফিজ আমাকে চিনল না।

তোমার চোখ এত লাল কেন - নির্মলেন্দু গুণ


তোমার চোখ এত লাল কেন

নির্মলেন্দু গুণ

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভিতর থেকে দরজা খুলে দেবার জন্য।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত।

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী-সেবার দায় থেকে।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুক;
আমার জল লাগবে কি না, নুন লাগবে কি না,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরো একটা
তেলে-ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কি না।

এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরজা
খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক।
কাম-বাসনার সঙ্গী না হোক, কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুক; ‘তোমার চোখ এতো লাল কেন?’

স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো - নির্মলেন্দু গুণ


স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

নির্মলেন্দু গুণ

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’

এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না।
তাহলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?

জানি, সেদিনের সব স্মৃতি, মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত। তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ...।

দন্ডকারণ্য - নির্মলেন্দু গুণ


দন্ডকারণ্য

নির্মলেন্দু গুণ (১৯৪৫-

প্রায় ত্রিশ বছর পর আজ হঠাৎ রেখার চিঠি পেয়ে
আমি তো অবাক। পাছে চিনতে ভুল করি তাই
নিজের পরিচয় দিয়েই রেখা শুরু করেছে তার চিঠিঃ

‘আমি রেখা। জানি, আজ আমাকে চিনতে
তোমার কষ্ট হবার কথা, সে তো আজকের কথা নয়।
আমি ছিলাম তোমার ছোট বেলার খেলার সাথী গো,
এ কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে আজ পুনর্বার
অনুভব করলুম, লজ্জা নামক মেয়েলী বোধটা একেবারে
উবে যায়নি তোমার এই পোড়ামুখী বোনটির রক্ত থেকে।
পাছে পোড়খাওয়া এই বুকে প্রেম নিবেদনের তৃষ্ণা জেগে ওঠে।
তাই শুরুতেই বলি, তুমি কবি হয়েছো বলেই
আমাদের রক্তের সম্পর্ক যায় নি ছোট হয়ে-
আমি বকুল মাসীর মেয়ে যে, এবার মনে পড়লো?

ক্লিক করলেই ইনকাম