প্রকৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রকৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৯

শীত রাত | জীবনানন্দ দাশ


শীত রাত
__জীবনানন্দ দাশ

এই সব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে;
বাইরে হয়তো শিশির ঝরছে, কিংবা পাতা,
কিংবা প্যাঁচার গান; সেও শিশিরের মতো, হলুদ পাতার মতো।
শহর ও গ্রামের দূর মোহনায় সিংহের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে -
সার্কাসের ব্যথিত সিংহের।
এদিকে কোকিল ডাকছে - পউষের মধ্যরাতে;
কোনো-একদিন বসন্ত আসবে ব'লে?
কোনো-একদিন বসন্ত ছিলো, তারই পিপাসিত প্রচার?
তুমি স্থবির কোকিল নও? কত কোকিলকে স্থবির হ'য়ে যেতে দেখেছি,
তারা কিশোর নয়,
কিশোরী নয় আর;
কোকিলের গান ব্যবহৃত হ'য়ে গেছে।
সিংহ হুঙ্কার ক'রে উঠছে:
সার্কাসের ব্যথিত সিংহ,
স্থবির সিংহ এক - আফিমের সিংহ - অন্ধ - অন্ধকার।
চারদিককার আবছায়া- সমুদ্রের ভিতর জীবনকে স্মরণ করতে গিয়ে
মৃত মাছের পুচ্ছের শৈবালে, অন্ধকার জলে, কুয়াশার পঞ্জরে হারিয়ে যায় সব।
সিংহ অরন্যকে পাবে না আর
পাবে না আর
পাবে না আর
কোকিলের গান
বিবর্ণ এঞ্জিনের মত খ'শে খ'শে
চুম্বক পাহাড়ে নিস্তব্ধ।
হে পৃথিবী,
হে বিপাশামদির নাগপাশ, - তুমি
পাশ ফিরে শোও,
কোনোদিন কিছু খুঁজে পাবে না আর।

মঙ্গলবার, ১ আগস্ট, ২০১৭

রে কিশোর

আহসান হাবীব


 কে বলে জন্মান্ধ তুই
 তোরও দুই চোখে
ছিলো আলো
স্বর্গের অমল জ্যোতি ছিলো।

 চোখ মেলে তুইও অনায়াসে
আজীবন নীলাকাশ
বনভূমি
রূপালি নদীর স্রোত
মনোরম অন্ধকার রাতের জোনাকি
 দেখে যেতে যেতে
জন্মের সমস্ত ঋণ শুধে যাবি
এই কথা ছিল।

অস্থানে ভূমিষ্ঠ তুই
পৃথিবীর আলো
 তোকে স্পর্শ করার আগেই
 তোর চোখে বানানো আন্ধার
তীক্ষ্ম বল্লমের মত ছুঁড়ে দিয়েছিল যে দুর্জন
আমি তাকে চিনি।

না তুই জন্মান্ধ ন’স
বানোয়াট অন্ধতার বেড়া
এই ভ্রান্তি
                      ভুলে যা ভুলে যা
বুকের আগুনে ক্লান্ত করতল
 নে জ্বালিয়ে নে রে
জ্বলন্ত আঙুলে
 বিদ্ধ কর দুই চোখ
দৃষ্টি ফিরে পাবি, তুই
মাথা তুলে দাঁড়া
দে তোর অমল দৃষ্টি মেলে দে ভুবনে।

 দেখে নে শ্যামল বিভা বনানীর
বনরাজীনীলা
এই পৃথ্বী
নদী
নারী
শস্য মাঠ চিনে নে, এবং
তারো আগে শত্রু শিবির।

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০১৬

সে নেই


আহসান হাবীব


এখনো ভোরের রোদে সোনা ঝরে-
কুড়িয়ে নেবার
কিশোর ছেলেটি নেই।

শীতের সকালে
নিঃশেষ শিউলির ডাল,
বোশেখে বকুল
নাম ধরে ডাক দেয় ;
সাড়া নেই।
যার
নিজের খুশীতে রাত ভোর হতো
কাকভোরে তার
এখন ভাঙে না ঘুম।
সকালের সোনা
অকারণে ছুঁয়ে ছেনে সাগরজোয়ার
জাগাবার কেউ নেই,
কেউ নেই তাকিয়ে দেখার
চোখ মেলে।

মঙ্গলবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৬

কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড

আব্দুল মান্নান সৈয়দ


এখানে কবিতা বানানো হয়।
সব ধরনের কবিতা।
রাজনীতিক কবিতা, সামাজিক কবিতা।
নাগরিক কবিতা, গ্রামীণ কবিতা।
প্রেমের কবিতা, শরীরের কবিতা।
স্বপ্নের কবিতা, বাস্তবের কবিতা।
চল্লিশের কবিতা, পঞ্চাশের কবিতা।
ষাটের কবিতা, সত্তরের কবিতা।
আশির কবিতাও আমরা বাজারে ছাড়ছি শিগগিরই।
কবিতার হাত, পা, মাথা, ধড়,
শিশ্ন, যোনি, চুল, নখ,
চোখ, মুখ, নাক, কান,
হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল--
সব-কিছু মওজুদ আছে আমাদের এখানে।
স্বদেশি ও বিদেশি উপমা ও চিত্রকল্প,
শব্দ ও ছন্দ,
অন্ত্যমিল ও মধ্যমিল
লক্ষ লক্ষ জমা আছে আমাদের স্টকে।

শুক্রবার, ১৮ মার্চ, ২০১৬

শিশুতীর্থ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



----------------------------
রাত কত হল?
উত্তর মেলে না।
কেননা, অন্ধ কাল যুগ-যুগান্তরের গোলকধাঁধায় ঘোরে, পথ অজানা,
পথের শেষ কোথায় খেয়াল নেই।
পাহাড়তলিতে অন্ধকার মৃত রাক্ষসের চক্ষুকোটরের মতো;
স্তূপে স্তূপে মেঘ আকাশের বুক চেপে ধরেছে;
পুঞ্জ পুঞ্জ কালিমা গুহায় গর্তে সংলগ্ন,
মনে হয় নিশীথরাত্রের ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ;
দিগন্তে একটা আগ্নেয় উগ্রতা
ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে আর নেভে
ও কি কোনো অজানা দুষ্টগ্রহের চোখ-রাঙানি।
ও কি কোনো অনাদি ক্ষুধার লেলিহ লোল জিহ্বা।
বিক্ষিপ্ত বস্তুগুলো যেন বিকারের প্রলাপ,
অসম্পূর্ণ জীবলীলার ধূলিবিলীন উচ্ছিষ্ট;
তারা অমিতাচারী দৃপ্ত প্রতাপের ভগ্ন তোরণ,
লুপ্ত নদীর বিস্মৃতিবিলগ্ন জীর্ণ সেতু,
দেবতাহীন দেউলের সর্পবিবরছিদ্রিত বেদী,
অসমাপ্ত দীর্ণ সোপানপঙ্‌ক্তি শূন্যতায় অবসিত।
অকস্মাৎ উচ্চণ্ড কলরব আকাশে আবর্তিত আলোড়িত হতে থাকে
ও কি বন্দী বন্যাবারির গুহাবিদারণের রলরোল।
ও কি ঘূর্ণ্যতাণ্ডবী উন্মাদ সাধকের রুদ্রমন্ত্র-উচ্চারণ।
ও কি দাবাগ্নিবেষ্টিত মহারণ্যের আত্মঘাতী প্রলয়নিনাদ।

শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০১৫

বিদ্রোহী (কবিতা)

কাজী নজরুল ইসলাম   

[মে ২৪, ১৮৯৯ আগস্ট ২৯, ১৯৭৬]


                                বল বীর –
                 বল উন্নত মম শির,
শির     নেহারি' আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
                          বল বীর –
   বল      মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'
              চন্দ্র সূর্য্ গ্রহ তারা ছাড়ি'
         ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া
         খোদার আসন আরশছেদিয়া,
             উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম   ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
                        বল বীর –
             আমি    চির-উন্নত শির।


          আমি    চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা
   প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
          আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
              আমি দুর্বার,
          আমি    ভেঙে করি সব চুরমার!
          আমি    অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
  আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
          আমি   মানিনাকো কোন আইন,
আমি  ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
          আমি  ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
          আমি  বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
                          বল বীর 
                  চির-  উন্নত মম শির!


বুধবার, ১১ জুন, ২০১৪

নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়

নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়
হেলাল হাফিজ

হেলাল হাফিজ

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

মিছিলের সব হাত
        কন্ঠ
        পা এক নয়।
যেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,
কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার।

শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে
অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহবানে,
কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে।

আমাদের মা

আমাদের মা
হুমায়ুন আজাদ

হুমায়ুন আজাদ

আমাদের মাকে আমরা বলতাম তুমি, বাবাকে আপনি।
আমাদের মা গরিব প্রজার মতো দাঁড়াতো বাবার সামনে
কথা বলতে গিয়ে কখনোই কথা শেষ ক’রে উঠতে পারতো না
আমাদের মাকে বাবার সামনে এমন তুচ্ছ দেখাতো যে
মাকে আপনি বলার কথা আমাদের কোনোদিন মনেই হয়নি।
আমাদের মা আমাদের থেকে বড় ছিল,
কিন্তু ছিলো আমাদের সমান,
আমাদের মা ছিলো আমাদের শ্রেণীর,
আমাদের বর্ণের, আমাদের গোত্রের।
বাবা ছিলেন অনেকটা আল্লাহর মতো,
তার জ্যোাতি দেখলে আমরা সেজদা দিতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা সিংহের মতো,
তাঁর গর্জনে আমরা কাঁপতে থাকতাম
বাবা ছিলেন অনেকটা আড়িয়ল বিলের প্রচন্ড চিলের মতো,
তার ছায়া দেখলেই
মুরগির বাচ্চার মতো আমরা মায়ের ডানার নিচে লুকিয়ে পড়তাম।

মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

মেজাজ

মেজাজ
সুভাষ মুখোপাধ্যায়

সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩)

থলির ভেতর হাত ঢেকে
শাশুড়ি বিড়বিড় ক’রে মালা জপছেন;
বউ
গটগট ক’রে হেঁটে গেল।
আওয়াজটা বেয়াড়া; রোজকার আটপৌরে নয়।
যেন বাড়িতে ফেরিঅলা ডেকে
শখ ক’রে নতুন কেনা হয়েছে।

সুতরাং
মালাটা থেমে গেল; এবং
চোখ দুটো বিষ হয়ে
ঘাড়টাকে হেলিয়ে দিয়ে যেদিকে বউ যাচ্ছিলো
সেইদিকে ঢ’লে পড়লো।

শাড়ি - সুবোধ সরকার

শাড়ি
সুবোধ সরকার

সুবোধ সরকার (১৯৫৮- )

বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা
অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা
এতো শাড়ি একসঙ্গে সে জীবনে দেখেনি।

আলমারির প্রথম থাকে সে রাখল সব নীল শাড়িদের
হালকা নীল একটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই আমার আকাশ
দ্বিতীয় থাকে রাখল সব গোলাপীদের
একটা গোলাপীকে জড়িয়ে সে বলল, তোর নাম অভিমান
তৃতীয় থাকে তিনটি ময়ূর, যেন তিনদিক থেকে ছুটে আসা সুখ
তেজপাতা রং যে শাড়িটার, তার নাম দিল বিষাদ।
সারা বছর সে শুধু শাড়ি উপহার পেল
এত শাড়ি সে কী করে এক জীবনে পরবে?

শাশ্বতী

শাশ্বতী
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

শ্রান্ত বরষা, অবেলার অবসরে,
প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল কায়া
স্বর্ণ সুযোগে লুকোচুরি-খেলা করে
গগনে গগনে পলাতক আলো-ছায়া।
আগত শরৎ অগোচর প্রতিবেশে;
হানে মৃদঙ্গ বাতাসে প্রতিধ্বনি;
মূক প্রতীক্ষা সমাপ্ত অবশেষে,
মাঠে, ঘাটে, বাটে আরব্ধ আগমনী।
কুহেলীকলুষ, দীর্ঘ দিনের সীমা
এখনই হারাবে কৌমুদীজাগরে যে;
বিরহ বিজন ধৈর্যের ধূসরিমা
রঞ্জিত হবে দলিত শেফালীশেজে।
মিলনোৎসবে সেও তো পড়েনি বাকী;
নবান্নে তার আসন রয়েছে পাতা
পশ্চাতে চায় আমারই উদাস আঁখি;
একবেণী হিয়া ছাড়ে না মলিন কাঁথা।।

উটপাখি

উটপাখি
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

আমার কথা কি শুনতে পাও না তুমি?
কেন মুখ গুঁজে আছো তবে মিছে ছলে?
কোথায় লুকোবে? ধু-ধু করে মরুভূমি;
ক্ষ’য়ে-ক্ষ’য়ে ছায়া ম’রে গেছে পদতলে।
আজ দিগন্তে মরীচিকাও যে নেই;
নির্বাক, নীল, নির্মম মহাকাশ।
নিষাদের মন মায়ামৃগে ম’জে নেই;
তুমি বিনা তার সমূহ সর্বনাশ।
কোথায় পলাবে? ছুটবে বা আর কত?
উদাসীন বালি ঢাকবে না পদরেখা।
প্রাকপুরাণিক বাল্যবন্ধু যত
বিগত সবাই, তুমি অসহায় একা।।

ছাড়পত্র

ছাড়পত্র
সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত ভট্টাচার্য

যে শিশু ভুমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুম:
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।

খর্বদেহ নিঃসহায় তবু তার মুষ্টিবদ্ধ হাত
উত্তোলিত, উদ্ভাসিত
কী এক দুর্ব্যোধ্য প্রতিজ্ঞায়।

সে ভাষা বুঝে না কেউ,
কেউ হাসে, কেউ করে মৃদু তিরস্কার।

বোধন

বোধন
সুকান্ত ভট্টাচার্য

সুকান্ত ভট্টাচার্য

হে মহামানব, একবার এসো ফিরে
শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভীড়ে,
এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার;
লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।
এই যে আকাশ, দিগন্ত, মাঠ স্বপ্নে সবুজ মাটি
নীরবে মৃত্যু গেড়েছে এখানে ঘাঁটি;
কোথাও নেইকো পার
মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যার
আঘাতে আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল,
এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল,
ভাঙা ঘর, ফাঁকা ভিটেতে জমেছে নির্জনতার কালো,
হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতায় আগুন জ্বালো।

আমি সেই মেয়ে

আমি সেই মেয়ে

শুভ দাশগুপ্ত

আমি সেই মেয়ে।
বাসে ট্রেনে ট্রামে রাস্তায় আপনি যাকে রোজ দেখেন
যার শাড়ি, কপালের টিপ, কানের দুল আর পায়ের গোড়ালি
আপনি রোজ দেখেন।
আর, আরও অনেক কিছু দেখতে পাবার স্বপ্ন দেখেন।
স্বপ্নে যাকে ইচ্ছে মতন দেখেন।
আমি সেই মেয়ে।
বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামে দিনের আলোয় যার ছায়া মাড়ানো
আপনার ধর্মে নিষিদ্ধ, আর রাতের গভীরে যাকে বস্তি থেকে
তুলে আনতে পাইক বরকন্দাজ পাঠান আপনি
আর সুসজ্জিত বিছানায় যার জন্য অপেক্ষায় অধীর হয়
আপনার রাজকীয় লাম্পট্য
আমি সেই মেয়ে।
আমি সেই মেয়ে- আসামের চা বাগানে ঝুপড়ি কামিন বস্তি থেকে
যাকে আপনি নিয়ে যেতে চান সাহেবি বাংলোয় মধ্যরাতে
ফায়ার প্লেসের ঝলসে ওঠা আলোয় মদির চোখে দেখতে চান
যার অনাবৃত শরীর
আমি সেই মেয়ে।

রূপালি স্নান

রূপালি স্নান
শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান

শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ
অথবা প্রখর ধু-ধু পিপাসার আঁজলা ভরানো পানীয়ের খোঁজ
শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্নের কাছে এসে রোজ
চাইনি তো আমি। দৈনন্দিন পৃথিবীর পথে চাইনি শুধুই
শুকনো রুটির টক স্বাদ আর তৃষ্ণার জল। এখনো যে শুই
ভীরু-খরগোশ-ব্যবহৃত ঘাসে, বিকেলবেলার কাঠবিড়ালিকে
দেখি ছায়া নিয়ে শরীরে ছড়ায়,- সন্ধ্যা নদীর আঁকাবাঁকা জলে
                                                  মেঠো চাঁদ লিখে
রেখে যায় কোনো গভীর পাঁচালি-দেখি চোখ ভ’রে;
ঝিঁঝিঁ’র কোরাসে স্তব্ধ, বিগত রাত মনে ক’রে
উন্মন-মনে হরিণের মতো দাঁতে ছিঁড়ি ঘাস,
              হাজার যুগের তারার উৎস ঐ যে আকাশ
তাকে ডেকে আনি হৃদয়ের কাছে, সোনালি অলস মৌমাছিদের
পাখা-গুঞ্জনে জ্বলে ওঠে মন, হাজার-হাজার বছরের ঢের
পুরোনো প্রেমের কবিতার রোদে পিঠ দিয়ে বসি, প্রগাঢ় মদের
চঞ্চলা সেই রসে-টুপটুপ নর্তকী তার নাচের নূপুর
             বাজায় হৃদয়ে মদির শব্দে, ভ'রে ওঠে সুরে শূন্য দুপুর

যখন বৃষ্টি নামলো

যখন বৃষ্টি নামলো
শক্তি চট্টোপাধ্যায়

শক্তি চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৪-১৯৯৫)

বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে, নৌকা টলোমলো
কূল ছেড়ে আজ অকূলে যাই এমনও সম্বল
নেই নিকটে- হয়তো ছিলো বৃষ্টি আসার আগে
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, তাই কি মনে জাগে
পোড়াবাড়ির স্মৃতি? আমার স্বপ্নে মেশাও দিন?
চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, চলচ্ছক্তিহীন।

বৃষ্টি নামলো যখন আমি উঠোন পানে একা
দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা
হয়তো মেঘে-বৃষ্টিতে বা শিউলিগাছের তলে
আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে
কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ করে
ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে!

আনন্দ ভৈরবী

আনন্দ ভৈরবী
শক্তি চট্টোপাধ্যায়

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি
এমন ছিলনা আষাঢ় শেষের বেলা
উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল
আনন্দ ভৈরবী।
আজ সেই গোঠে আসেনা রাখাল ছেলে
কাঁদেনা মোহনবাঁশিতে বটের মূল
এখনো বরষা কোদালে মেঘের ফাঁকে
বিদ্যুৎ-রেখা মেলে।

সে কি জানিতনা এমনি দুঃসময়
লাফ মেরে ধরে লাল মোরগের ঝুঁটি
সে কি জানিতনা হৃদয়ের অপচয়
কৃপণের বামমুঠি
সে কি জানিতনা যত বড় রাজধানী
তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর
সে কি জানিতনা আমি তারে যত জানি
আনখ সমুদ্দুর।
আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি
এমন ছিলনা আষাঢ় শেষের বেলা
উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল
আনন্দ ভৈরবী।

পৃথিবী

পৃথিবী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করো, পৃথিবী
শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদিতলে॥
মহাবীর্যবতী তুমি বীরভোগ্যা,
বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে,
মিশ্রিত তোমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে,
মানুষের জীবন দোলায়িত কর তুমি দুঃসহ দ্বন্দ্বে।
ডান হাতে পূর্ণ কর সুধা,
বাম হাতে চূর্ণ কর পাত্র,
তোমার লীলাক্ষেত্র মুখরিত কর অট্টবিদ্রুপে;
দুঃসাধ্য কর বীরের জীবনকে মহৎ জীবনে যার অধিকার।
শ্রেয়কে কর র্দুমূল্য, কৃপা কর না কৃপাপাত্রকে।
তোমার গাছে গাছে প্রচ্ছন্ন রেখেছ প্রতি মুহূর্তের সংগ্রাম,
    ফলে শস্যে তার জয়মাল্য হয় সার্থক।

একবার পরাজিত হলে

একবার পরাজিত হলে
মুহম্মদ নূরুল হুদা

মুহম্মদ নূরুল হুদা

একবার পরাজিত হলে পুনর্বার পরাজিত হব
        এই ভয় থাকে না আমার
জন্মেই মৃত্যুর কোলে রেখেছি শৈশব
কুৎসিত রোগের হাতে বিকিয়েছি সুন্দরের স্বপ্ন আরাধনা
মায়ের পাণ্ডুর মুখ মিমিষেই দূরান্বয়ী হলে
জন্মসূত্রে উৎসহীন ভেবেছি নিজেকে।

যেদিন গভীর রাতে কুয়াশার আঘাত বাঁচিয়ে
দেখলাম হাটফেরা পিতার শরীর
        বিবর্ণ শরীরে তাঁর
পিতামহী ঝাড়লেন তুকতাক ফুঁক
সেদিন জেনেছি আমি সুফলা মাঠের বুকে
নিশাচর ওত পাতে, ভূত আর জ্বিন শুধু রূপকথা নয়।

ক্লিক করলেই ইনকাম