প্রেম-বিরহ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রেম-বিরহ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

আমরা সবাই যাযাবর | জুয়েল আদীব


'মুছেই না হয় গেলাম।
কার তাতে কীইবা আসে যায়।'
কথাটা যত অনায়াসে বলা যায়,
অভিব্যক্তি ততটা সহজসাধ্য নয়।
অথবা কারো অভিমান জমা বিস্তর,
অজানা-অচেনা আক্ষেপে বিক্ষুব্ধ মন,
কেউ হয়তো আনমনে বলেই ফেললো-
'না ফিরলে কী আসে যায়!'
কিন্তু বুকের চিনচিন ব্যথা তীব্র হয়,
ধুকপুকানি হাহাকার উথলে ওঠে,
অন্তরে অন্তর্নিহিত কান্না বাষ্পীভূত হয়।
একটি অস্পৃশ্য সাক্ষাতের জন্য নিরবে
অপেক্ষা করতে হয় কাউকে কুড়িবছর!
আবার কারো হয়তো একজনম গেলেও
প্রিয় মানুষের দেখা পায় না সচরাচর,
অপেক্ষার প্রহর গিয়ে প্রতীক্ষায় ঠেকে
তবু আখিরাতে দেখা হবে আশায় থাকে।
অনন্ত মিনতি চেনা-অচেনা পথিকের,
নিঃশব্দ আকুতি চিরচেনা মাতৃভূমির-
কিছু স্মৃতিচিহ্ন রেখো শৈশবের দেশে
ফিরে আসিও দুরন্ত কিশোরীর বেশে।
স্বাগত জানাতে অধীর প্রতীক্ষায় থাকবে-
আজন্ম জলাভূমি, বিবর্ণ মাঠের ধুলোবালি
নদীর ঢেউ, বালুচর আর সাম্পান পতাকা।
হোক তা ফেরারি, তবু ফিরে এসো বারবার,
আসতেই হবে- আমরা যে সবাই যাযাবর।

শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৪

শূন্য পূরণ | অনন্যা পোদ্দার (আজ কোর্টের ১৭ নম্বর এজলাসে এক অভিনব কেস উঠেছে)

গল্প: শূন্য পূরণ

আজ কোর্টের ১৭ নম্বর এজলাসে এক অভিনব কেস উঠেছে। এক ভদ্রমহিলা জীবনের মধ্যাহ্ন পেরিয়ে এসে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হতে চান, নিঃশর্তে। অথচ, স্বামী তার স্ত্রীকে কিছুতেই ছাড়তে চান না।

বিষয়টা এইরকম— চাকরিরতা স্ত্রী, বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছে, হঠাৎ করেই ইচ্ছে প্রকাশ করলেন যে, আর সংসার করবেন না তিনি। সংসার করতে তার আর ভালো লাগছে না। তাই, সব কিছু থেকে নিজেকে মুক্ত করতে নিঃশর্তে ডিভোর্স চাইছেন দাম্পত্য জীবন থেকে। কিন্তু স্বামী চান, স্ত্রীর সাথে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটাতে। একমাত্র মেয়ে তার নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত, তাই জীবনের বাকি সময়টা স্ত্রীয়ের সাথে একান্তে, আনন্দে কাটিয়ে দিতে চান তিনি।

শুক্রবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

উল্লেখযোগ্য স্মৃতি | নির্মলেন্দু গুণ


উল্লেখযোগ্য স্মৃতি

__নির্মলেন্দু গুণ

আমার ভালোবাসা কিংবা প্রেম-সংক্রান্ত
কোনো স্মৃতি নেই, যাকে ঠিক ভালোবাসা
কিংবা প্রেম বলা যায়।

একদিন টুকুদি নাকের ডগার বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে
বলেছিল: তোর বউ তোকে খুব ভালবাসবে দেখিস।
সে-ই আমার প্রেম, সেই আমার সর্বপ্রথম কল্পনায়
রমনীয় ভালোবাসা পাওয়া, হঠাৎ যৌবন-ছোঁয়া
কিশোরের প্রথম প্রণয়। আর কোনো স্মৃতি নেই।

একদিন নখ কাটতে কাটতে আঙুল কেটে গেলে
প্রেমের শিশির হয়ে রক্ত ঝরেছিল,
ডেটলে রক্তাক্ত ক্ষত ধুয়ে মুছে দিয়ে পূরবী বলেছিল,
আমি তার চিরকালের শত্রু।
আমি আজও শত্রু-মিত্র তফাৎ বুঝি না।
নিজের শত্রু হয়ে আমি আজও অপেক্ষমান,
ঘুরেফিরে স্মৃতির সমুখে এসে এখনো দাঁড়াই।

আমার এছাড়া ভালোবাসা কিংবা প্রেমের কাছাকাছি
আর কোনো স্মৃতি নেই, সে-ই আমার প্রেম,
অদ্যবধি সেই আমার পূণ্য ভালোবাসা!

আমার একাকী যাত্রা, জীবনের নিঃসঙ্গতা বুঝে
সদ্যবিবাহিতা আমারই সহোদরা
সিঁথিতে রঙিন চাঁদ মেখে একদিন
শিয়রের কাছে বসেছিল: চল ক'দিন আমার বাড়ি,
সমুদ্রের হাওয়ায় কাটাবি।

আমি জানি আজো সেই সমুদ্রের হাওয়া,
আজো সেই একমাত্র ভালবাসা স্মৃতি,
আজো সেই মুহূর্তের প্রেম।

আমার ভালোবাসা কিংবা প্রেম-সংক্রান্ত
আর কোনো স্মৃতি নেই।

শুক্রবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২০

বাসর | হুমায়ূন আহমেদ



বাসর
__হুমায়ূন আহমেদ


কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে তার সঙ্গে দেখা।
লোহার তৈরি ছোট্ট একটা ঘর।
বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোন যোগ নেই।
ঘরটা শুধু উঠছে আর নামছে।
নামছে আর উঠছে।
মানুষ ক্লান্ত হয়–
এ ঘরের কোন ক্লান্তি নেই।
এ রকম একটা ঘরেই বোধহয় বেহুলার বাসর হয়েছিল।
নিশ্ছিদ্র লোহার একটা ঘর।
কোন সাপ সেখানে ঢুকতে পারবে না।
হিস হিস করে বলতে পারবে না, পাপ করো। 
পৃথিবীর সব আনন্দ পাপে।
পুণ্য আনন্দহীন। উল্লাসহীন।
পুণ্য করবে আকাশের ফিরিশতারা।
কারণ পুণ্য করার জন্যেই তাদের তৈরি করা হয়েছে।
লোহার সেই ঘরে ঢোকার জন্য সাপটা পথ খুঁজছিলো।
সেই ফাঁকে বেহুলা তাঁর স্বামীকে বললেন, 
কী হয়েছে, তুমি ঘামছ কেন?
আর তখন একটা সুতা সাপ ঢুকে গেলো।
ফিসফিস করে কোন একটা পরামর্শ দিতে গেলো।
বেহুলা সেই পরামর্শ শুনলেন না বলেই কি লখিন্দরকে মরতে হল?

তার সঙ্গে আমার দেখা কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে।
ঘরটা শুধু ওঠে আর নামে।
আমি তাকে বলতে গেলাম- 
আচ্ছা শুনুন, আপনার কি মনে হচ্ছে না
এই ঘরটা আসলে আমাদের বাসর ঘর?
আপনি আর কেউ নন, আপনি বেহুলা।
যেই আপনি ভালবেসে আমাকে কিছু বলতে যাবেন
ওম্নি একটা সুতা সাপ এসে আমাকে কামড়ে দেবে।
আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন। 
দয়া করে কিছু বলবেন না।

#কাব্যগ্রন্থ: গৃহত্যাগী জোছনা

শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না | আবিদ আজাদ



যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না 
__আবিদ আজাদ

যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে যুদ্ধ শেষের ভাঙা পোড়া একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি
তোমাকে ঘিরে সারা ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে স্কার্টপরা বুড়ি বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা
তোমাকে ঘিরে সারা ক্ষণ ঝুলে থাকবে তছনছ তারের জটিলতা
লতাগুল্মময় ক্রেনের কঙ্কাল, জংপড়া লোহালক্কড় আর হিংস্র ঘাসের মধ্যে ধু–ধু করবে তোমার জীবন
ভয়ার্ত সব মিলিটারি ভ্যান আর উল্টে থাকা ট্রলির পাশে ক্ষত–বিক্ষত একটা চাঁদ ওঠা রানওয়ের মতো
তুমি মুখ লুকিয়ে রাখবে গা–ছমছম করা জ্যোৎস্নায়।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে জনহীন কোনো পেট্রোল পাম্পের দেয়াল ঘেঁষে একটা মরা শিউলি গাছের মতো বেঁচে থাকবে তুমি –
তোমাকে ঘিরে হা–হা করবে নিদাঘরাত
দেখবে পর্যুদস্ত একটা হেলমেটের ফাটল দিয়ে মাথা তুলছে একগুচ্ছ সবুজ তৃণ
শুনবে ধ্বংসস্তুপের মধ্যে অর্ধডোবা সূর্যাস্তের মতো আগুন লাগা বিলুপ্তপ্রায় লাউঞ্জ থেকে ভেসে আসছে প্রেতহাসির শব্দ
আর তোমাকে ঘিরে নামবে এক জোড়া জনশূণ্য বুটের স্তব্ধতা।
যে শহরে আমি নেই থাকব না সে শহরে প্রতিদিন দুর্ঘটনা দিয়ে শুরু হবে তোমার ভোর
সকাল সাতটা থেকেই অনবরত টেলিফোনে আসতে থাকবে সানস্ট্রোকের সংবাদ
তোমার পাশের সাততলা জানালা থেকে লাফিয়ে পড়বে কোঁকড়াচুলের যুবক
একদিন গলায় ক্ষুর চালাতে–চালাতে ঘুমিয়ে পড়বেন সেই বুড়ো
সবুজ রঙের গলাবন্ধ পরে চকচকে বেতের স্টিক হাতে যিনি মনিংওয়াকে বেরুতেন রোজ
একটি কিশোরী তার আব্বার রেজর থেকে লুকিয়ে খুলে নেবে ব্লেড
গভীর জ্যোৎস্নাঙ্কিত স্ট্রিটের মাথায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়বে কালো রঙের গাড়ি
একজন মানুষ শিরীষ গাছের ভিতরে টিপে ধরবে আর একজন মানুষের গলা
পার্কের ঝরাপাতার উপর সারা রাত ধরে শিশিরে ভিজে যাবে মৃত তরুণীর হাঁটুর ভাঁজ
যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে চরম দুর্বোধ্যতম হয়ে বেড়ে উঠবে তোমার বিষণ্ণ সন্তান
বারবার করে বদলাতে হবে তার ঝাপসা চোখের চশমার গ্লাস
তুমি তাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে ভোরের ইস্কুলে
কিন্তু কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না নীল হাফপ্যান্টপরা তোমার ছেলে, আসবে না
তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে ইস্কুল–বাড়ির সামনে :  রাস্তার ওপারে –
যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে নিয়মিত দুধের বোতল দিয়ে যাবে ডেইরি ফার্মের গাড়ি
কিন্তু সেই দুধে মেশানো থাকবে গুঁড়োবিষ
তোমার ফ্রিজের ভিতরে মরে পড়ে থাকবে সাদা ইঁদুর
তোমার ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় বসে থাকবে একটা তেলাপোকা তার রং হবে মারাত্মক রকম লাল
তোমার ওয়ারড্রোবের ভিতর থেকে হ্যাঙ্গার শুদ্ধ ঝাঁপিয়ে পড়বে মধ্যরাতের কাপড়চোপড়
তুমি পালাতে চাইবে পালাতে চাইবে
ছুটে পালাবে
ছুটবে
ছুটতে ছুটতে তুমি তিনতলার জানলার একখন্ড পরদার মতো আটকে যাবে বারবার
তুমি ঊধ্বশ্বাসে ছুটে পালাবে ঘুমের ভিতর
কিন্তু মৃত শহর শাণিত করে রাখবে তার সমস্ত রাস্তার বালি
তারার ভিতর থেকে সারা রাত ধরে খসে পড়বে চুন
হঠাৎ লক্ষ–লক্ষ হাতের করতালি বেজে উঠবে আতঙ্কিত মোড়ে–মোড়ে
দেখবে সাদা ট্রাফিক দাঁড়িয়ে আছে বাজপড়া তালগাছের মতো
তার হাত দুটো ঝুলছে চাঁদহীন মরা ডালের মতো
চোখের লোমহর্ষক দুটো গর্তের ভিতর দিয়ে চলেছে বিষাক্ত পিঁপড়ের বাহিনী
তার মাথার ফাটলে গজিয়েছে একটা বটচারা
তোমার ভয়ার্ত চিৎকারে শুধু সেই মৃত ট্রাফিকের লাল
হা–এর ভিতর থেকে উড়ে যাবে একটা সন্ত্রস্থ বনটিয়া।
যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে লিফট তোমাকে নিয়ে সোজা নেমে যাবে পাতালে
তোমাকে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পার্কের ধারের খাদে ছিটকে পড়বে বাস
লেকের হাঁসগুলি গুগলির মতো ঠুকরে খাবে মানুষের চোখ
আর খুব বিকেলবেলায় তুমি ক্লান্ত হয়ে
ক্লান্ত হয়ে
ক্লান্ত হয়ে
ফিরবে ঘরে
কিন্তু তোমার ঘরের নিঃসঙ্গ দরোজা তোমাকে খুলে দেবে হুহু শীতার্ত প্রান্তর
তোমার সোফা তোমাকে বসতে দেবে না পাঠিয়ে দেবে বেডরুমের বিছানায়
তুমি বাথরুমে যাবে, শাওয়ার খুলে দিলে ঝরবে রক্ত তুমি বেসিনে নুয়ে পড়বে, পানির ঝাপটা দিতেই মনে হবে
কার গলা যেন কাশতে–কাশতে পাঠিয়ে দিচ্ছে যক্ষার ফুল
তুমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে,
দেখবে বীভৎস একটা চিড় ধরে আছে আয়নায়।
সেই চিড়–ধরা আয়নার ভিতরে তারপর ক্রমশ হারিয়ে যাবে তোমার আর্তনাদ
আর তোমার মনে হবে, আমি নেই।

বুধবার, ১১ জুলাই, ২০১৮

স্মারক

___সুকান্ত ভট্টাচার্য

_________________
আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়
তবুও পড়িবে মনে,
চঞ্চল হাওয়া যদি ফেরে কভু হৃদয়ের আঙিনায়
রজনীগন্ধা বনে,
তবুও পড়িবে মনে।
বলাকার পাখা আজও যদি উড়ে সুদূর দিগঞ্চলে
বন্যার মহাবেগে,
তবুও আমার স্তব্ধ বুকের ক্রন্দন যাবে মেলে
মুক্তির ঢেউ লেগে,
বন্যার মহাবেগে,
বাসরঘরের প্রভাতের মতো স্বপ্ন মিলায় যদি
বিনিদ্র কলরবে
তবুও পথের শেষ সীমাটুকু চিরকাল নিরবধি
পার হয়ে যেতে হবে,
বিনিদ্র কলরবে।

মঙ্গলবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৮

আরশিতে সর্বদা এক উজ্জ্বল রমনী | পুর্নেন্দু পত্রী



আরশিতে সর্বদা এক উজ্জ্বল রমনী
__পুর্নেন্দু পত্রী

 
আরশিতে সর্বদা এক উজ্জ্বল রমণী বসে থাকে।
তার কোনো পরিচয়, পাসপোর্ট, বাড়ির ঠিকানা
মানুষ পায়নি হাত পেতে।
অনুসন্ধানের লোভে মুলত সর্বতোভাবে তাকে পাবে বলে
অনেক মোটর গাড়ি ছুটে গেছে পাহাড়ের ঢালু পথ চিরে
অনেক মোটর গাড়ি চুরমার ভেঙে গেছে নীল সিন্ধুতীরে
তারও আগে ধ্বসে গেছে শতাধিক প্রাসাদের সমৃদ্ধ খিলান
হাজার জাহাজ ডুবি হয়ে গেছে হোমারের হলুদ পাতায়।
আরশির ভিতরে বসে সে রমণী ভ্রু-ভঙ্গিতে আলপনা আঁকে
কর্পুর জলের মতো স্নিগ্ধ চোখে হেসে বা না হেসে
নানান রঙ্গীন উলে বুনে যায় বন উপবন
বেড়াবার উপত্যকা, জড়িয়ে ধরার যোগ্য কুসুমিত গাছ
লোভী মাছরাঙা চায় যতটুকু জল আর মাছ
যতটুকু জ্যোৎস্না পেলে মানুষ সন্তুষ্ট হয় স্নানে।
 
স্নানের ঘাটে সে নিজে কিন্তু তারও স্নান চাই বলে
অনেক সুইমিং পুল কার্পেট বিছানো বেডরুমে
অনেক সুগন্ধী ফ্ল্যাট পার্ক স্ট্রীটে জুহুর তল্লাটে
ডানলোপিলোর ঢেউ ডাবলবেডের সুখী খাটে
জোনাকী যেভাবে মেশে অন্ধকারে সর্বস্ব হারিয়ে
প্রভাতে সন্ধ্যায় তারা সেইভাবে মিলেমিশে হাঁটে।
বহু জল ঘাঁটাঘাঁটি স্নান বা সাঁতার দিতে দিতে
মানুষেরা একদিন অনুভব করে আচম্বিতে
যে ছিল সে চলে গেছে নিজের উজ্জ্বল আরশিতে।
প্রাকৃতিক বনগন্ধ, মেঘমালা, নক্ষত্রের থালা
কিংবা এই ছ’রকম ঋতুর প্রভাবে
এত নষ্ট হয়ে তবু মানুষ এখনও ভাবে সুনিশ্চিত তাকে কাছে পাবে
কাল কিংবা অন্য কোন শতাব্দীর গোধুলি লগনে
কলকাতায়, কানাডায় অথবা লন্ডনে।

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০১৬

ক্রান্তিকাল


আহসান হাবীব

মধ্যরাতে রাজপথে দেখি এক নারীর শরীর-
যে নারী নায়িকা ছিলো কোনোকালে এই পৃথিবীর।

র্সবাঙ্গ পুড়েছে তার বণিকের তৃষ্ণার উত্তাপ,
হৃদয়ের রক্ত নিয়ে রেখে গেছে নখরের ছাপ ;
দেখে মনে হয়
বহুভোগ্যা এই নারী,
এ হৃদয় সে হৃদয় নয়।
একদিন এই নারী ইতিহাস-বিন্যাসের ভার
নিয়েছিল নিজ দেহে,
পৃথিবীর সঙ্গীত-সভার
যে নারী সম্রাজ্ঞী ছিলো,
অন্ধকার রাত্রির প্রহরে
 আজ দেখি সেই নারী রাজপথে আর্তনাদ করে।

কোথাও লাবণ্য নেই জেগে আছে ভয় ও বিস্ময়,
অভীপ্সার আলো থেকে বিচ্ছুরিত সে নারী এ নয়।

তনুর তনিমা ঘিরে আজ নেই হৃদয়ের ডাক
কুৎসিত কঙ্কাল ঘিরে ইতিহাস-নগরী নির্বাক।
আসমুদ্র আকাশের একাগ্র প্রেমের পরিণতি
এক সুরে উৎসারিত পৃথিবীর প্রথম প্রণতি
ব্যর্থ আজ।
লালসার পাশব লুন্ঠন
ঘটে গেছে। অতঃপর এই নারী খুলেছে গুন্ঠন
জনহীন রাজপথে অন্ধকারে ক্লান্ত দুই হাতে
আর তার সাথে
সভ্যতা-নারীর হাটে দেখি শত আকুঞ্চিত ভাল
ভয়ে ভীত শত শত সভ্যতার চতুর দালাল।

সে নেই


আহসান হাবীব


এখনো ভোরের রোদে সোনা ঝরে-
কুড়িয়ে নেবার
কিশোর ছেলেটি নেই।

শীতের সকালে
নিঃশেষ শিউলির ডাল,
বোশেখে বকুল
নাম ধরে ডাক দেয় ;
সাড়া নেই।
যার
নিজের খুশীতে রাত ভোর হতো
কাকভোরে তার
এখন ভাঙে না ঘুম।
সকালের সোনা
অকারণে ছুঁয়ে ছেনে সাগরজোয়ার
জাগাবার কেউ নেই,
কেউ নেই তাকিয়ে দেখার
চোখ মেলে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুন, ২০১৬

তাহারেই পড়ে মনে

বেগম সুফিয়া কামাল


“হে কবি! নীরব কেন-ফাল্গুন যে এসেছে ধরায়,
বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”
কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি-
“
দখিন দুয়ার গেছে খুলি?
বাতাবী নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?
দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?”

“এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম “কেন কবি আজ
এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুষ্পসাজ?”
কহিল সে সুদূরে চাহিয়া-
“
অলখের পাথার বাহিয়া
তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?
ডেকেছে কি সে আমারে? -শুনি নাই,রাখিনি সন্ধান।”

কহিলাম “ওগো কবি, রচিয়া লহ না আজও গীতি,
বসন্ত-বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি-এ মোর মিনতি।”
কহিল সে মৃদু মধুস্বরে-
“
নাই হ’ল, না হোক এবারে-
আমার গাহিতে গান! বসন্তরে আনিতে ধরিয়া-
রহেনি,সে ভুলেনি তো, এসেছে তো ফাল্গুন স্মরিয়া।”

কহিলাম “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?
যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।”
কহিল সে পরম হেলায়-
“
বৃথা কেন? ফাগুন বেলায়
ফুল কি ফোটে নি শাখে? পুষ্পারতি লভে নি কি ঋতুর রাজন?
মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নি সে অর্ঘ্য বিরচন?”


“হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?”
কহিলাম “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”
কহিল সে কাছে সরি আসি-
“
কুহেলী উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
গিয়াছে চলিয়া ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে। তাহারেই পড়ে মনে, ভুলিতে পারি না কোন মতে।”

বসন্ত বন্দনা

নির্মলেন্দু গুণ


হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্রসঙ্গীতে যত আছে,
হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে
বনের কুসুমগুলি ঘিরে। আকাশে মেলিয়া আঁখি
তবুও ফুটেছে জবা,—দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে,
তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্ত পথিক।

এলিয়ে পড়েছে হাওয়া, ত্বকে কী চঞ্চল শিহরন,
মন যেন দুপুরের ঘূর্ণি-পাওয়া পাতা, ভালোবেসে
অনন্ত সঙ্গীত স্রোতে পাক খেয়ে, মৃত্তিকার বুকে
নিমজ্জিত হতে চায়। হায় কি আনন্দ জাগানিয়া।

এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতই ফেরাই চোখ,
যতই এড়াতে চাই তাকে, দেখি সে অনতিক্রম্য।
বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্যখানি
নবীন পল্লবে, ফুলে ফুলে। বুঝি আমাকেও শেষে
গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে।

আমি তাই লঘুচালে বন্দিলাম স্বরূপ তাহার,
সহজ অক্ষরবৃত্তে বাঙলার বসন্ত বাহার।

শুক্রবার, ১৮ মার্চ, ২০১৬

কবর

জসীমউদ্দিন


এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা।
সোনালী ঊষায় সোনামুখে তার আমার নয়ন ভরি,
লাঙ্গল লইয়া ক্ষেতে ছুটিতাম গাঁয়ের ও-পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত,
এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোর তামাশা করিত শত।

এমন করিয়া জানিনা কখন জীবনের সাথে মিশে,
ছোট-খাট তার হাসি-ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।
বাপের বাড়িতে যাইবার কালে কহিত ধরিয়া পা,
আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।
শাপলার হাটে তরমুজ বেচি দু পয়সা করি দেড়ী,
পুঁতির মালা এক ছড়া নিতে কখনও হতনা দেরি।
দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,
সন্ধ্যাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুর বাড়ির বাটে !
হেস না–হেস না–শোন দাদু সেই তামাক মাজন পেয়ে,
দাদী যে তোমার কত খুশি হোত দেখিতিস যদি চেয়ে।
নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, ‘এতদিন পরে এলে,
পথপানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখি জলে।’

শিশুতীর্থ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর



----------------------------
রাত কত হল?
উত্তর মেলে না।
কেননা, অন্ধ কাল যুগ-যুগান্তরের গোলকধাঁধায় ঘোরে, পথ অজানা,
পথের শেষ কোথায় খেয়াল নেই।
পাহাড়তলিতে অন্ধকার মৃত রাক্ষসের চক্ষুকোটরের মতো;
স্তূপে স্তূপে মেঘ আকাশের বুক চেপে ধরেছে;
পুঞ্জ পুঞ্জ কালিমা গুহায় গর্তে সংলগ্ন,
মনে হয় নিশীথরাত্রের ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ;
দিগন্তে একটা আগ্নেয় উগ্রতা
ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে আর নেভে —
ও কি কোনো অজানা দুষ্টগ্রহের চোখ-রাঙানি।
ও কি কোনো অনাদি ক্ষুধার লেলিহ লোল জিহ্বা।
বিক্ষিপ্ত বস্তুগুলো যেন বিকারের প্রলাপ,
অসম্পূর্ণ জীবলীলার ধূলিবিলীন উচ্ছিষ্ট;
তারা অমিতাচারী দৃপ্ত প্রতাপের ভগ্ন তোরণ,
লুপ্ত নদীর বিস্মৃতিবিলগ্ন জীর্ণ সেতু,
দেবতাহীন দেউলের সর্পবিবরছিদ্রিত বেদী,
অসমাপ্ত দীর্ণ সোপানপঙ্‌ক্তি শূন্যতায় অবসিত।
অকস্মাৎ উচ্চণ্ড কলরব আকাশে আবর্তিত আলোড়িত হতে থাকে —
ও কি বন্দী বন্যাবারির গুহাবিদারণের রলরোল।
ও কি ঘূর্ণ্যতাণ্ডবী উন্মাদ সাধকের রুদ্রমন্ত্র-উচ্চারণ।
ও কি দাবাগ্নিবেষ্টিত মহারণ্যের আত্মঘাতী প্রলয়নিনাদ।

রবিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৫

এক জন্ম

'এক জন্ম' 

___তারাপদ রায়

অনেকদিন দেখা হবে না
তারপর একদিন দেখা হবে।
দুজনেই দুজনকে বলবো,
‘অনেকদিন দেখা হয়নি’।

এইভাবে যাবে দিনের পর দিন
বৎসরের পর বৎসর।
তারপর একদিন হয়ত জানা যাবে
বা হয়ত জানা যাবে না,
যে তোমার সঙ্গে আমার
অথবা আমার সঙ্গে তোমার
আর দেখা হবে না।

শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০১৫

বিদ্রোহী (কবিতা)

কাজী নজরুল ইসলাম   

[মে ২৪, ১৮৯৯ – আগস্ট ২৯, ১৯৭৬]


                                বল বীর –
                 বল উন্নত মম শির,
শির     নেহারি' আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
                          বল বীর –
   বল      মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'
              চন্দ্র সূর্য্ গ্রহ তারা ছাড়ি'
         ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া
         খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
             উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম   ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
                        বল বীর –
             আমি    চির-উন্নত শির।


          আমি    চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা
–   প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
          আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
              আমি দুর্বার,
          আমি    ভেঙে করি সব চুরমার!
          আমি    অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
  আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
          আমি   মানিনাকো কোন আইন,
আমি  ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
          আমি  ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
          আমি  বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
                          বল বীর –
                  চির-  উন্নত মম শির!


বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৫

আসমানী

আসমানী 

জসীম উদ্দীন

আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
একটুখানি হাওয়া দিলেই ঘর নড়বড় করে,
তারি তলে আসমানীরা থাকে বছর ভরে।
পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষী দিছে অনাহারে কদিন গেছে তার।
মিষ্টি তাহার মুখটি হতে হাসির প্রদীপ-রাশি
থাপড়েতে নিবিয়ে দেছে দারুণ অভাব আসি।
পরনে তার শতেক তালির শতেক ছেঁড়া বাস,
সোনালি তার গা বরণের করছে উপহাস।
ভোমর-কালো চোখ দুটিতে নাই কৌতুক-হাসি,
সেখান দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু রাশি রাশি।
বাঁশির মতো সুরটি গলায় ক্ষয় হল তাই কেঁদে,
হয় নি সুযোগ লয় যে সে-সুর গানের সুরে বেঁধে।
আসমানীদের বাড়ির ধারে পদ্ম-পুকুর ভরে
ব্যাঙের ছানা শ্যাওলা-পানা কিল্-বিল্-বিল করে।
ম্যালেরিয়ার মশক সেথা বিষ গুলিছে জলে,
সেই জলেতে রান্না-খাওয়া আসমানীদের চলে।
পেটটি তাহার দুলছে পিলেয়, নিতুই যে জ্বর তার,
বৈদ্য ডেকে ওষুধ করে পয়সা নাহি আর।

সোমবার, ১ জুন, ২০১৫

বিদায়


___রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
                   তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
                             ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল--
                             তুলে নিল দ্রুতরথে
                   দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
                             তোমা হতে বহুদূরে।
                             মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
                             পার হয়ে আসিলাম
          আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,
          রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
                             আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
                             দূর হতে যদি দেখ চাহি
                                      পারিবে না চিনিতে আমায়।
                                                হে বন্ধু, বিদায়।

কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে,
                            বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
                            ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
                            তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতপ্রদোষে
                            হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা-স্বপ্নের মুরতি।
                            তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
                            সে আমার প্রেম।
                            তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
                            পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
                                      কালের যাত্রায়।
                                      হে বন্ধু, বিদায়।

                            তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত-মুরতি
                            যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
                                                হোক তব সন্ধ্যাবেলা।
                                                পূজার সে খেলা
          ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে;
                   তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানসভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
                   তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
                   আজও তুমি নিজে
                   হয়তো বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
                   ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
                                      হে বন্ধু, বিদায়।

                   মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
                   মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
                   সেই ধন্য করিবে আমাকে।
                   শুক্লপক্ষ হতে আনি
                   রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
                                      যে পারে সাজাতে
                   অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ-রাতে,
                   যে আমারে দেখিবারে পায়
                                      অসীম ক্ষমায়
                   ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
          এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
                   তোমারে যা দিয়েছিনু, তার
                   পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
                   হেথা মোর তিলে তিলে দান,
          করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
                   হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম,
                                      হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
                             হে বন্ধু, বিদায়।




ক্লিক করলেই ইনকাম